ক্যাম্পাসের জানালায়...

ক্যাম্পাসের জানালায়...

রবিবার সন্ধ্যায় রুমে এসে ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করতেছি। থিসিসের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ম্যাটেরিয়ালস খুজতেছিলাম। হঠাৎ খুব উচ্চ স্বরে মাইকের আওয়াজ কানে আসলো আমার- বেবিওয়ালা খাইছেরে সামনে বসাইয়া, বারে বারে ব্রেক মারে নরম জায়গা পাইয়া।

মধ্যরাত পর্যন্ত হরেক রকমের গান বাজলো। তারপর হঠাৎ করে চারপাশ নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। যেন কোথাও কেউ নেই। সম্বিত ফিরে পাওয়ার পর অগত্যা মনে হইলো আজকের মতো জলসা শেষ। এবার একটু শান্তি মতো কাজ-কর্ম করা যাবে।

পরদিন পৃথিবীতে সোমবার নেমে এলো। রবিবার শেষ হয়ে সোমবার সন্ধ্যা নামার পরও শান্তিতে কাজ-কর্ম করার ব্যাপারে আমি কোনোভাবে নিশ্চিত হইলাম না। অপেক্ষায় থাকলাম। কখন মাইকের আওয়াজ কানে আসে! সে এক ভীষণ আবেগী অপেক্ষা। প্রেমিকার ফোনকল বা মেসেঞ্জারের মেসেজর জন্যেও আমি এতো গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি না। কিছুক্ষণ পর একজন হুজুর সুরেলা কন্ঠে শুরু করলেন-

পাঁচ ওয়াক্ত নিয়মিত নামাজ পড়তে হবে। সবকিছুর সাথে আপোষ করা যাবে, কিন্তু নামাজের সাথে কোন আপোষ চলবে না। জোরে বলেন ঠিক কিনা!

আগত ভক্তকুল, সমস্বরে চিৎকার করে বললেন- ঠিক।

এভাবে একটু ওয়াজ-নসিহত চলে আর নিয়মিত বিরতিতে সমস্বরে ভক্তকুল বলে উঠেন- ঠিক। এভাবেই মধ্যরাত পর্যন্ত ঠিক-বেঠিক এর দোলাচলে ওয়াজ-নসিহত চললো। ভক্তকুলের অনুরোধে হুজুর তার সুরেলা কণ্ঠে আজান দিলেন। ভক্তকুল অধীর আগ্রহ নিয়ে আজান শুনলেন। তারপর হুজুর মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তার ওয়াজ-নসিহত শেষ করলেন।

সোমবারের পর অবধারিতভাবে পৃথিবীতে মঙ্গলবার হাজির হলো। বিষ্যুদবার নিয়ে নানা জনের কাছে নানা গল্প-কথা শুনেছি। কিন্তু মঙ্গলবার নিয়ে কোন গল্প-কথা আমাকে কেউ বলেনি। আমি আজকে খুব চুপচাপ আছি। আমি নিশ্চিত ছিলাম, আমি মঙ্গলবার নিয়ে কিছু জানতে পারবো।

বন্ধুরা রাতে খিচুড়ী রান্না করেছে, সাথে ডিমভাজি আর দেশি কৈ আর টেংরা মাছের ভাজি। ব্যাচেলরের খাবার, ভাজিভুজিতেই সীমাবদ্ধ! খাইতে বসছি। অজ্ঞতা, কোথা থেকে যেন বাঁশির সুর কানে আসলো। এক বন্ধু জিজ্ঞেস করলো- বাঁশি বাজাচ্ছে কে? তারপর আমার আর বুঝতে বাঁকি রইলো না।

আজকেও কোনো জলসা বসেছে। যেখানে বাউল গান বাজতেছে। যদিও গানের কথা কোনটাই বুঝতে পারছি না। তবুও এই গান মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে। আমার প্রচন্ড অনিচ্ছা স্বত্তেও এই বাঁশির সুর শুনতে হবে। যদিও আমি অনেকক্ষণ ধরে গানের কথা বোঝার চেষ্টা করতেছি। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। যা বুঝতেছি তা কেবলই চিৎকার আর চিৎকার।

জাহাঙ্গীরনগরের সীমানা প্রাচীর ঘেষে ইসলামনগর আর গেরুয়া। এখানে নানা অঞ্চলের নানান মানুষের বসবাস। কিন্তু এই গানের জলসা, ওয়াজ-নসিহতের সময় সবাই মিলেমিশে একাকার। শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইসলামনগর আর গেরুয়াতে গানের জলসা, ওয়াজ-নসিহত পালাক্রমে চলতে থাকে। আজ গান, কাল ওয়াজ।

আমার দেখা সবথেকে সহনশীল মানুষ এই ইসলামনগর আর গেরুয়াতে বসবাস করে। আমার মনে হয় এরা একাধারে, সংস্কৃতিমনা, ধর্মভীরু এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতি। গান এবং ওয়াজের সময় যদি কখনো কনফ্লিক্ট করে দুটোই একসাথে চালাতে এরা কখনো দ্বিধা করে না।

আপনাদের জন্য প্রতিদিন এতো এতো বিনোদন ও জ্ঞান পাই। আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা না জানালে অন্যায় হবে। আমার মনে হয় শুধু আমি না, পুরো জাহাঙ্গীরনগরবাসী আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

আপনাদের জন্য অনেক অনেক অনেক শুভকামনা ও ভালোবাসা।

লেখকঃ শাহিন রেজা,শিক্ষার্থী, আইন অনুষদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

#এসএস/বিবি/২৪-১২-২০১৯

ক্যাটেগরী: মত

ট্যাগ: মত

মত ডেস্ক, বিবি বুধ, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৯ ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

Comments (Total 0)